ডিপ্রেশন । কেবল মন খারাপ নয়

HEALTHx

 


যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের মন খারাপ করে দেয়। এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মন খারাপের মাত্রা কিংবা স্থায়িত্ব যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন সেটিকে বলে ডিপ্রেশন।
 একজন মানুষের যেকোন সময়ে ডিপ্রেশন হতে পারে,তবে প্রথম আক্রান্ত হওয়াটা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সাধারণত বেশি দেখা যায়। নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার পুরুষদের থেকে বেশি। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ৩ ভাগের ১ ভাগ নারীরা তাদের জীবনের যেকোন এক সময় মেজর ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়েছেন। ডিপ্রেশন ও মন খারাপ এক নয় ! আমাদের দেশে একটি বহুল প্রচারিত ভূল ধারণা হচ্ছে,মন খারাপেরই অপর নাম হচ্ছে ডিপ্রেশন । 

 

২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীর হার শতকরা ৬.৭ শতাংশ। ডিপ্রেশন একজন মানুষকে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে বিকলাঙ্গ করে দিতে সক্ষম। বিশ্বব্যাপী এরকম সব অসুখের তালিকার মধ্যে ডিপ্রেশনের স্থান চতুর্থ। শুধু মানসিক রোগের তালিকার মধ্যে ডিপ্রেশনের অবস্থান প্রথম।
প্রত্যেক বছর প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি ১৫ জনের ১জন ডিপ্রেশনে ভোগেন। প্রতি ৬ জনের ১ জন তাদের জীবনে কোন একসময় ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়েছেন।

 

ডিপ্রেশনের ধরন: ডিপ্রেশনের ধরন বা ক্লাসিফিকেশনের তালিকাটা বেশ লম্বা। ক্লিনিক্যালি যে ক্লাসিফিকেশনটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেটি হলো-

যে ডিপ্রেশনের পেছনে আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ পাওয়া যায় না, তাকে বলে Endogenous বা বায়োলজিকাল ডিপ্রেশন
আর যে ডিপ্রেশনের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনা বা সমস্যা পাওয়া যায়, সেটি হলো Reactive depression.

ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার প্রকারভেদটি সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিপ্রেশন সম্পর্কিত প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হচ্ছে- ডিপ্রেশন হতে হলে তার পেছনে অবশ্যই কোনো না কোন কারণ থাকতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই, এমন কোনো মানুষ যদি ডিপ্রেশনের কথা বলেন, আমরা তার সমস্যাকে হেসেই উড়িয়ে দেই। ফলাফল, এ মানুষগুলো সঠিক চিকিৎসার অভাবে দিনের পর দিন মানসিক কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ান।

 

ডিপ্রেশনের কারণ: ডিপ্রেশনের কারণ হিসেবে এককথায় বলা যায় সেরোটনিনের হ্রাস। কথায় বলে, Serotonin is happiness. যদিও সেরোটনিন ছাড়া আরও নিউরোট্রান্সমিটারের (যেমন- ডোপামিন, নরইপিনেফ্রিন, গাবা ইত্যাদি) তারতম্য ঘটে থাকে। তবুও সবচেয়ে বেশি প্রভাব হচ্ছে সেরোটনিনের।

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেরোটনিন কেন কমে?
প্রথমত, কারো যদি বংশে ডিপ্রেশনের হিস্ট্রি থাকে (ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভদের মাঝে)। তাদের রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২০-৩০%। অন্যদিকে কারো কারো ব্যক্তিত্বের ধরন থাকে এমন যেটি ডিপ্রেশনের প্রভাবক। আবার আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ ছাড়াই সেরোটনিন কমতে পারে যা বায়োলজিকাল ডিপ্রেশন।

দ্বিতীয়ত, প্রতিকূল পরিবেশ বা ঘটনা ডিপ্রেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক। বিশেষত, জীবনের প্রথমার্ধে ঘটে যাওয়া কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, যেটিকে আমরা বলি Adverse early life experiences। পরবর্তী জীবনে ডিপ্রেশন হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এজন্য দেখা যায়, যেসব বাচ্চা ছোটবেলার কোনো ঘটনায় বড় ধরনের মানসিক আঘাত পেয়ে থাকে (যেমন- বাবা-মায়ের ডিভোর্স, বাবা-মা মারা যাওয়া, শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ইত্যাদি)। তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই পরবর্তীতে ব্যক্তিত্বের সমস্যা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে দেখা দেয় বিষণ্নতা।

লিঙ্গভেদেও ডিপ্রেশনের তারতম্য দেখা যায়। সাধারণত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ডিপ্রেশন হওয়ার হার দ্বিগুণ। এর কারণ হিসেবে অনেকগুলো হাইপোথিসিস আছে। এক, মেয়েরা স্বভাবগতভাবেই তাদের কষ্টের অনুভূতিগুলো মনের মধ্যে চেপে রাখে। যেটা পরবর্তীতে প্রকাশ পায় ডিপ্রেশন আকারে। দুই, বিভিন্ন সমাজে প্রথাগতভাবেই ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার বেশি হয় মেয়েরা। তিন, মেয়েদের হরমোনাল তারতম্য।

এসবের বাইরে ছেলেদের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের হার কম হওয়ার দুটি ইন্টারেস্টিং থিওরি আছে। যার একটি হলো- ছেলেরা সহজে ডিপ্রেশনের কথা স্বীকার করতে চায় না। এর কারণ সম্ভবত সমাজের সেই চিরায়ত রীতি, ‘ছেলেদের কখনো কষ্ট পেতে নেই। কষ্ট পাওয়া, কান্নাকাটি করা সেসব তো মেয়েদের কাজ!’ আরেকটি হলো- ভুল ডায়াগনোসিস। বেশিরভাগ ছেলেই ডিপ্রেশন ভুলতে গিয়ে নেশার জগতে ডুব দেয়। ডাক্তারের কাছে যখন আসে; তখন সে একজন পুরোদস্তুর মাদকাসক্ত। ফলাফল, এসব রোগীরা ডিপ্রেসড হিসেবে ডায়াগনোসড না হয়ে ডায়াগনোসড হয় ‘সাবস্টেন্স এবিউজার’ হিসেবে।


লক্ষণসমূহ: ডিএসএম-৫ অনুযায়ী ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডারগুলোর একটি সবচেয়ে কমন ডিজঅর্ডারটি হলো ‘Major Depressive Disorder’ বা সংক্ষেপে এমডিডি।
এই এমডিডি’র কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণ আছে। লক্ষণগুলো নিম্নরূপ-

লক্ষণগুলোর মধ্যে যদি অন্তত ৫টি বা তার বেশি লক্ষণ (যাদের মধ্যে একটি অবশ্যই প্রথম দুটির একটি) যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে অন্তত ২ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থাকে এবং এগুলো তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়, তবেই তাকে আমরা Major Depressive Disorder বলব।

মনে রাখবেন, ‘দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটা’ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, অনেকেই আছেন যারা লক্ষণগুলো নিয়েও হয়তো নিজেদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছেন, তাদের আমরা ডিপ্রেশনের আওতায় আনব না।

 

ব্যতিক্রমী লক্ষণসমূহ: আলোচ্য লক্ষণগুলো ছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের কিছু ব্যতিক্রমী লক্ষণ দেখা যায়। বিশেষত, বাচ্চারা বেশিরভাগ সময়ই মন খারাপের চেয়ে ‘খিটখিটে মেজাজ’ নিয়ে আসে। সেক্ষেত্রে কোনো বাবা-মা যদি এমন অভিযোগ করেন যে, তার হাসিখুশি সন্তান হঠাৎ করেই খুব খিটখিটে হয়ে গেছে। তখন অন্যান্য ডায়াগনোসিসের সাথে সাথে ডিপ্রেশনের ব্যাপারটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

আরেকটি ব্যতিক্রমী লক্ষণ হলো ‘মুড রিয়্যাক্টিভিটি’। সাধারণত ডিপ্রেসড মানুষের কোনো কিছুতেই মন ভালো হয় না, আনন্দের সংবাদ শুনলেও আনন্দ লাগে না। তবে যাদের মুড রিয়্যাক্টিভিটি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে মন খারাপ থাকলেও কোনো আনন্দের সংবাদ শুনলে বা আনন্দের ঘটনা হলে তাদের মন কিছু সময়ের জন্য হলেও ভালো লাগে।

এর বাদে ডিপ্রেশনের রোগীরা প্রায়ই বিভিন্ন শারীরিক কম্পলেইন নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসেন। বিশেষ করে আমাদের দেশে; আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে গ্রামাঞ্চলে এবং পরিবারের নারী সদস্যদের, যেখানে মনের রোগের তেমন কোনো গুরুত্বই নেই, সেখানে ‘আমার মন খারাপ’ কথাটি বলার চেয়ে ‘আমার মাথা ব্যথা, মাথার তালু জ্বলে’ বললে পরিবারের সদস্যদের কাছে ডাক্তার দেখানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া যায়।

তবে এর মানে এই নয় যে, রোগী এগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলেন। সত্যিকার অর্থেই ডিপ্রেশনের রোগীদের সোমাটিক সিম্পটমস থাকে। কিন্তু সেই সাথে তাদের মনটাও খারাপ থাকে। একটু ভালোমত হিস্ট্রি নিলেই যেটা বের হয়ে আসে।

 

ডিপ্রেশন এবং বিরেভমেন্ট: ডিপ্রেশনের কাছাকাছি কিছু বিষয় আছে, যেগুলো অনেক সময় ডিপ্রেশন হিসেবে ভুল ডায়াগনোসিস হয়। তেমন একটি বিষয় হচ্ছে বিরেভমেন্ট (Bereavement)। বিরেভমেন্ট অর্থ খুব কাছের কোনো মানুষের আকস্মিক মৃত্যু পরবর্তী শোক। প্রিয় মানুষের মৃত্যু কারোরই কাম্য নয়। আর সেই মৃত্যু যদি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত, তাহলে শোকের পাল্লা আরও ভারি হয়ে যায়।

এধরনের শোকে অনেক সময় মানুষের কিছু মানসিক লক্ষণ এবং আচরণ দেখা দেয়, যেগুলো এরকম পরিস্থিতি বিবেচনায় খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে এটিকে ডিপ্রেশন বলে মনে হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, বিরেভমেন্ট থেকে কী কখনো ডিপ্রেশন হতে পারে? এর উত্তর হচ্ছে- ‘হ্যাঁ’। বিরেভমেন্ট একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু সেটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এ নির্দিষ্ট সময়কাল হচ্ছে ছয় মাস। কিন্তু কারো যদি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বিরেভমেন্টের সিম্পটমগুলো থেকে যায়, তখন সেটিকে আমরা কমপ্লেক্স বিরেভমেন্ট (complex bereavement) বলি। কমপ্লেক্স বিরেভমেন্ট একটি পর্যায়ে গিয়ে ডিপ্রেশনের আকার ধারন করতে পারে।

ডিপ্রেশন বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার একটি এপিসোডিক রোগ। তাই এপিসোড আকারে রোগটি বারবার ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। বলা হয়ে থাকে, একবার এ অসুখ হলে পরবর্তীতে অসুখ ফিরে আসার সম্ভাবনা শতকরা ৮০ ভাগ। তবে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে, বংশে এ রোগের ইতিহাস থেকে না থাকলে এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন ও ডাক্তারের ফলোআপে থাকলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ডিপ্রেশনের চিকিৎসা: ডিপ্রেশনের চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে ডিপ্রেশনের মাত্রা এবং ধরন অনুযায়ী। সেই হিসেবে ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি দুটোরই ভূমিকা আছে। যেমন মাইল্ড ডিপ্রেশনে ওষুধ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, কিছু সাইকোথেরাপি যথেষ্ট। আবার মডারেট বা সিভিয়ার ডিপ্রেশনে ওষুধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাইকোথেরাপিরও প্রয়োজন হয়।

কাজেই আপনার আশেপাশের ডিপ্রেসড মানুষটিকে অবহেলা না করে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হন। সম্ভব হলে তাকে সঠিক চিকিৎসার আওতায় আনুন।

ডিপ্রেশনসহ যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ক্লিক করুন এখানে...